অণুজীব সার: পরিবেশবান্ধব কৃষিতে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ

আধুনিক কৃষিতে রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার একদিকে যেমন মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করছে, অন্যদিকে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অণুজীব সার (Biofertilizer) বর্তমানে সারা বিশ্বে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অণুজীব সার হলো প্রকৃতির নিজস্ব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণশক্তিকে ব্যবহার করে মাটি ও উদ্ভিদের পুষ্টি জোগানোর একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আজকের এই বিশদ আলোচনায় আমরা জানব অণুজীব সারের বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালী, এর প্রকারভেদ, সঠিক প্রয়োগ পদ্ধতি এবং কৃষি অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে।
(এই প্রবন্ধটি কৃষি শিক্ষা বিশেষ উৎপাদন সম্পৃক্ত কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ের ইউনিট ৫ এর ৫.১ নং পাঠের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য দ্বারা সমৃদ্ধ করা হয়েছে।)
অণুজীব সার

অণুজীব সার (Biofertilizer) কী?

যে সকল ক্ষুদ্র জীবকে খালি চোখে দেখা যায় না, কেবল অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়, তাদের অণুজীব বা জীবাণু (Microorganisms) বলা হয়। যখন উদ্ভিদ জগতের উপকারী অণুজীবগুলোকে (যেমন: ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল ও অ্যাকটিনোমাইসিটিস) কৃত্রিমভাবে কালচার বা বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে ফসলের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে অণুজীব সার বা বায়োফার্টিলাইজার বলে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, প্রাণীজগতের অণুজীব (যেমন: নেমাটোড বা প্রোটোজোয়া) দিয়ে সার তৈরি হয় না; অণুজীব সার শুধুমাত্র উদ্ভিদ জগতের উপকারী অণুজীব দ্বারা তৈরি করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাইজোবিয়ামের মতো জীবাণু সার ব্যবহার করলে চীনাবাদাম, মুগ, মসুর, ছোলা এবং সয়াবিনের শিকড়ে গুটি (Nodules) তৈরি হয়। এই গুটিগুলো বাতাস থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন টেনে এনে মাটিকে সমৃদ্ধ করে, যার ফলে ফসলের ফলন ২০% থেকে ৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

অণুজীব সারের প্রকারভেদ ও বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালী

কার্যকারিতা এবং পুষ্টি উপাদান সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে অণুজীব সারকে প্রধানত তিনটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়:

১. নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী অণুজীব সার (Nitrogen Fixing Biofertilizers)

বাতাসে প্রায় ৭৮% নাইট্রোজেন থাকলেও উদ্ভিদ তা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী অণুজীবগুলো বাতাসের এই নাইট্রোজেনকে গ্রহণ করে তা উদ্ভিদের ব্যবহারোপযোগী নাইট্রেট বা অ্যামোনিয়ায় পরিণত করে। এরা দুইভাবে কাজ করে:
ক. মুক্তজীবী নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Free-living Nitrogen Fixation):
এই শ্রেণির ব্যাকটেরিয়াগুলো (যেমন: Azotobacter, Clostridium, Beijerinckia) মাটিতে স্বাধীনভাবে বসবাস করে। এরা উদ্ভিদের শিকড়ের ভেতরে প্রবেশ করে না, বরং শিকড়ের চারপাশের মাটিতে (Rhizosphere) থেকে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে মাটিকে সমৃদ্ধ করে। এরা মারা যাওয়ার পর দেহস্থ নাইট্রোজেন সরাসরি মাটিতে মিশে যায় এবং উদ্ভিদ তা গ্রহণ করে।
  • ব্যবহার: ধান, গম, ভুট্টা, আখ, পাট, তুলা ইত্যাদি অশিম্বী (Non-leguminous) ফসলে অ্যাজোটোব্যাকটর সার ব্যবহার করা হয়।
  • সুবিধা: এই জীবাণুগুলো বছরে হেক্টর প্রতি ১০-২৫ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে সরবরাহ করতে পারে। নাইট্রোজেন সরবরাহের পাশাপাশি এরা কিছু উপকারী হরমোন (যেমন: IAA, Gibberellin) তৈরি করে, যা বীজের দ্রুত অঙ্কুরোদগম এবং চারার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ১০ কেজি বীজের সাথে মাত্র ২০০ গ্রাম এই জীবাণু সার মিশিয়ে বপন করলে প্রচুর রাসায়নিক সার সাশ্রয় হয়।
খ. মিথোজীবী নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Symbiotic Nitrogen Fixation):
এই প্রক্রিয়ায় Rhizobium (রাইজোবিয়াম) নামক ব্যাকটেরিয়া শিম্বীগোত্রীয় বা ডালজাতীয় ফসলের (Legumes) শিকড়ে প্রবেশ করে। উদ্ভিদ ব্যাকটেরিয়াকে আশ্রয় ও শর্করা জাতীয় খাবার দেয়, বিনিময়ে ব্যাকটেরিয়া বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে শিকড়ে ছোট ছোট গুটি বা নডিউল (Nodule) তৈরি করে উদ্ভিদকে পুষ্টি দেয়। এটিকে মিথোজীবিতা (Symbiosis) বলা হয়।
  • গুটির গুণাগুণ: শিকড়ের এই গুটিগুলো মূলত তিন রঙের হয়— বাদামি, সবুজ এবং গোলাপি-লাল। এর মধ্যে গোলাপি-লাল রঙের গুটিতে ‘লেগহিমোগ্লোবিন’ নামক পদার্থ থাকে, যা সবচেয়ে বেশি নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে পারে।
  • ব্যবহার: সয়াবিন, চিনাবাদাম, মুগ, মসুর, ছোলা, বরবটি ইত্যাদি ফসলে এটি ব্যবহৃত হয়। নির্দিষ্ট ডাল ফসলের জন্য নির্দিষ্ট প্রজাতির রাইজোবিয়াম কালচার ব্যবহার করতে হয়।
  • সুবিধা: একটি সফল মিথোজীবী সম্পর্কের মাধ্যমে বছরে হেক্টর প্রতি ১০০-৩০০ কেজি পর্যন্ত নাইট্রোজেন মাটিতে জমা হতে পারে এবং ফলন ৫০-১০০ ভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

 

অণুজীব সার

 

২. ফসফরাস দ্রবীভূতকারী অণুজীব সার (Phosphorus Solubilizing Biofertilizers)

মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ফসফরাস প্রাকৃতিকভাবে মজুদ থাকে, তবে তা ক্যালসিয়াম, লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে অদ্রবণীয় অবস্থায় থাকে। গাছ এই অদ্রবণীয় ফসফরাস গ্রহণ করতে পারে না। এমনকি আমরা যে টিএসপি (TSP) বা ফসফরাস সার জমিতে দিই, তার একটি বড় অংশ কিছুদিন পর অদ্রবণীয় হয়ে যায়।
  • কার্যপ্রণালী: কিছু বিশেষ ব্যাকটেরিয়া (যেমন: Bacillus subtilis, Pseudomonas striata) এবং ছত্রাক মাটিতে বেশ কিছু জৈব এসিড (যেমন: সাইট্রিক এসিড, ফিউমারিক এসিড) নিঃসরণ করে। এই এসিড অদ্রবণীয় ফসফরাস যৌগকে ভেঙে দ্রবণীয় ফসফেটে রূপান্তরিত করে, যা উদ্ভিদ সহজেই শিকড়ের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে।

৩. কম্পোস্ট তৈরিকারী অণুজীব সার (Composting Biofertilizers)

কৃষিজ বর্জ্য, খড়, লতাপাতা বা গোবরকে দ্রুত পচিয়ে উৎকৃষ্ট মানের কম্পোস্ট সার তৈরির জন্য কিছু বিশেষ অণুজীব ব্যবহার করা হয়।
  • কার্যপ্রণালী: Trichoderma (ট্রাইকোডার্মা), Aspergillus এর মতো ছত্রাক এবং Bacillus এর মতো ব্যাকটেরিয়া দ্রুত সেলুলোজ ও লিগনিন ভেঙে বর্জ্যকে জৈব সারে পরিণত করে। যেখানে সাধারণ নিয়মে কম্পোস্ট হতে ৩-৪ মাস সময় লাগে, সেখানে এই অণুজীবগুলো ব্যবহার করলে মাত্র ৩০-৪০ দিনেই উন্নতমানের কম্পোস্ট সার তৈরি হয়ে যায়।

 

আধুনিক কৃষিতে অণুজীব সারের ব্যবহারিক গুরুত্ব ও সুবিধা

১. পুষ্টির টেকসই সরবরাহ: অণুজীব সার রাসায়নিক সারের মতো সাময়িক কাজ করে না, বরং এরা মাটিতে বংশবৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদে মাটির পুষ্টি ও উর্বরতা বজায় রাখে।
২. রাসায়নিক সারের বিকল্প ও সাশ্রয়: এই সার ব্যবহারের ফলে ইউরিয়া বা টিএসপি সারের ওপর নির্ভরতা ২৫-৩০% পর্যন্ত কমানো যায়, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় দারুণভাবে হ্রাস করে।
৩. শিকড়ের সম্প্রসারণ: Mycorrhiza (মাইকোরাইজা) নামক ছত্রাকভিত্তিক অণুজীব সার উদ্ভিদের শিকড়ের পৃষ্ঠতল (Surface area) বাড়িয়ে দেয়। ফলে গাছ মাটির অনেক গভীর থেকে খনিজ লবণ ও পানি সংগ্রহ করতে পারে, যা খরা সহনশীলতা বাড়ায়।
৪. জৈবিক বালাইদমন (Biocontrol): Trichoderma এর মতো অণুজীব শুধু সার হিসেবেই কাজ করে না, এরা মাটিতে থাকা ক্ষতিকর রোগজীবাণু ও ছত্রাককে ধ্বংস করে প্রাকৃতিক বালাইনাশক (Biopesticide) হিসেবে কাজ করে।
৫. পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ: অণুজীব সার মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানুষ, পশুপাখি বা পরিবেশের ওপর কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব (Toxicity) ফেলে না।
৬. খাদ্যমান বৃদ্ধি: জীবাণু সার প্রয়োগে উৎপাদিত ফসলে আমিষ (প্রোটিন) এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিনের পরিমাণ ১৫-২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
৭. আগাছা দমন: Azolla (অ্যাজোলা) নামক জলজ ফার্ন ও এর সাথে মিথোজীবী হিসেবে থাকা Anabaena নামক নীলাভ-সবুজ শৈবাল ধানক্ষেতে নাইট্রোজেন সরবরাহের পাশাপাশি পানির উপরিভাগ ঢেকে রেখে আগাছা দমনেও চমৎকার কাজ করে।
অণুজীব সার

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা (Important Notes)

  • সংরক্ষণ: অণুজীব সার একটি জীবন্ত উপাদান। এটিকে কখনোই কড়া রোদে বা উচ্চ তাপমাত্রায় রাখা যাবে না। সবসময় ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।
  • মেয়াদকাল: প্যাকেটজাত জীবাণু সারের গায়ে লেখা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা ব্যবহার করতে হবে, কারণ নির্দিষ্ট সময় পর ভেতরের জীবাণুগুলো মারা যায়।
  • রাসায়নিক সারের সাথে মিশ্রণ: অণুজীব সার কখনোই সরাসরি ইউরিয়া, পটাশ বা অন্যান্য কড়া রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশকের সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করা যাবে না। এতে উপকারী অণুজীবগুলো মরে যায়।

 

অণুজীব সার

 

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. রাইজোবিয়াম সার কি সব ফসলেই ব্যবহার করা যায়?
না, রাইজোবিয়াম সার মূলত ডাল বা শিম্বীগোত্রীয় ফসলে (সয়াবিন, মসুর, মুগ) মিথোজীবী হিসেবে কাজ করে। ধান বা গমের মতো ফসলের জন্য অ্যাজোটোব্যাকটর বা মুক্তজীবী অণুজীব সার ব্যবহার করতে হয়।
২. অণুজীব সার ব্যবহারের ফলে কি রাসায়নিক সার একেবারে বন্ধ করা সম্ভব?
প্রাথমিক অবস্থায় রাসায়নিক সার একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে এর ব্যবহার ২৫% থেকে ৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে জৈব ও অণুজীব সার ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো হলে রাসায়নিক সারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
৩. জীবাণু সারের দাম কি রাসায়নিক সারের চেয়ে বেশি?
না, জীবাণু সারের উৎপাদন খরচ এবং বাজারমূল্য রাসায়নিক সারের তুলনায় অনেক কম। এটি পরিমাণে খুব সামান্য লাগে বিধায় কৃষকদের জন্য এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
৪. শিকড়ে গুটি (Nodule) তৈরি হলে তা উপকারী বুঝব কীভাবে?
ডাল ফসলের শেকড় মাটি থেকে সাবধানে তুলে যদি দেখা যায় শিকড়ে গোলাপি বা লালচে রঙের ছোট ছোট গুটি রয়েছে, তবে বুঝতে হবে রাইজোবিয়াম সফলভাবে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করছে। গুটিগুলো সাদা বা সবুজ রঙের হলে বুঝতে হবে সেগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
৫. অণুজীব সার বীজতলা নাকি মূল জমিতে ব্যবহার করা ভালো?
এটি বীজের সাথে মিশিয়ে (Seed treatment) বা চারা গাছের শিকড় দ্রবণে চুবিয়ে (Root dip) রোপণ করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
অণুজীব সার

মূল বিষয়গুলো একনজরে (Key Takeaways)

  • অণুজীব সার হলো উদ্ভিদ জগতের উপকারী জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক), যা মাটির পুষ্টি বাড়াতে এবং ফসলের ফলন বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
  • এটি রাসায়নিক সারের অত্যন্ত সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যকর এবং পরিবেশবান্ধব একটি বিকল্প।
  • রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া ডাল ফসলের শিকড়ে গুটি তৈরি করে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে আনে, যা ফলন ২০-৪০% পর্যন্ত বাড়ায়।
  • মাইকোরাইজা এবং ট্রাইকোডার্মা যথাক্রমে গাছের পুষ্টি গ্রহণে সহায়তা করে এবং মাটির ক্ষতিকর রোগজীবাণু ধ্বংস করে।
  • অণুজীব সার প্রয়োগের সময় রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।

মন্তব্য করুন