দিনাজপুরের খানসামায় গ্রীষ্মকালীন বেগুনের বাম্পার ফলন, চ্যালেঞ্জেও আশাবাদী কৃষক

দিনাজপুর, ৪ জুলাই, ২০২৬: দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার কৃষকরা ঐতিহ্যগতভাবে রবি শস্যের ওপর নির্ভরশীল হলেও, আধুনিক কৃষি পদ্ধতির সফল প্রয়োগ এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় সহযোগিতায় গ্রীষ্মকালীন বেগুন চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছেন। অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের ফলে চলতি মৌসুমে বেগুনের বাম্পার ফলন হওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে, যদিও সম্প্রতি বাজারদরে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে উপজেলার বিস্তীর্ণ বেগুনের ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। গ্রীষ্মকালীন এই ফসলকে ঘিরে তাদের স্বপ্ন আর পরিশ্রমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে। খানসামা উপজেলা কৃষি বিভাগের মাঠকর্মী রাশেদ হাসান জানান, গ্রীষ্মকালীন বেগুনের ভালো ফলন এবং মৌসুমের শুরুতে আশানুরূপ দাম পাওয়ায় কৃষকরা দারুণ খুশি। বেগুন বিক্রি নিয়ে কোনো ঝামেলা না থাকায় তাদের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে; পাইকাররা প্রতিদিন সরাসরি কৃষকের জমি থেকেই বেগুন সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন।

ভাবকি গ্রামের কৃষক সায়েদ আলীর মতো অনেকেই গত দুই বছর ধরে স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় আগাম জাতের গ্রীষ্মকালীন বেগুন চাষ করছেন। অধিক লাভের আশাতেই এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছেন তারা। গ্রীষ্মকালীন উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত জাতের বেগুন চাষ করে প্রতি বছরই ভালো মুনাফা পাচ্ছেন এখানকার কৃষকরা। তবে চলতি বছর চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়েছে। একই সাথে, এবার গ্রীষ্মকালীন বেগুন চাষির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে বেগুনের আমদানিও বেড়েছে, যার ফলে দাম কিছুটা কমেছে।

প্রথম দিকে যখন ফলন শুরু হয়েছিল, তখন কৃষকরা প্রতি মণ বেগুন দেড় হাজার থেকে এক হাজার সাতশ’ টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু গত কয়েকদিনে এই দাম কমে প্রতি মণ আটশ’ থেকে নয়শ’ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও দাম কমেছে, তবুও কৃষকরা হতাশ নন। তাদের বিশ্বাস, ফলন ভালো হওয়ায় লাভের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও, লোকসানের মুখে তাদের পড়তে হবে না।

বদলগাড়ী গ্রামের বর্গাচাষি মমিনুর রহমান এই বছর দুই বিঘা জমি ৩২ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে আগাম জাতের গ্রীষ্মকালীন বেগুন চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি বছর বেগুন চাষ করে ভালোই লাভ হতো। এ বছর হঠাৎ করেই জ্বালানি তেল, সার, কীটনাশক ও দিনমজুরের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় চাষের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তারপরও তিনি আশাবাদী, বেগুনের ভালো ফলনে তিনি লাভবান হতে পারবেন। তিনি আরও জানান, আগামী আশ্বিন মাস পর্যন্ত তারা বাজারজাত করতে পারবেন বলে আশা করছেন এবং সেই অনুযায়ী ক্ষেতের পরিচর্যা করছেন।

উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের সুবর্ণখুলি গ্রামের বেগুন চাষি রেজাউল ইসলামও উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে গত দু’বছর ধরে গ্রীষ্মকালীন বেগুন চাষ করছেন। এই বছর তিনি এক বিঘা জমিতে বেগুন লাগিয়েছেন এবং আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ফলন বেশ ভালো হয়েছে। তিনি আরও দেড় মাস ক্ষেতের বেগুন বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। যদিও হঠাৎ করে বাজারে দাম কমায় তিনি কিছুটা চিন্তিত, তবে ফলন ভালো হওয়ায় সেই ক্ষতি পুষিয়ে যাবে বলে তার বিশ্বাস।

একই এলাকার আরেক বেগুন চাষি আবু তালেব জানান, এ বছর আবহাওয়া ভালো থাকায় বেগুনের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রথম দিকে প্রায় টানা ১ মাস বেগুনের ভালো দাম পেয়েছেন, যা এখন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় বেগুন চাষে খরচ হয় কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তিনি ইতিমধ্যেই ৪৮ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করেছেন এবং আশা করছেন আরও ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করতে পারবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বেগুন ক্ষেত রোগমুক্ত থাকলে এবং আবহাওয়া অনুকূলসহ ভালো দাম থাকলে এক বিঘায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেগুন বিক্রি করা সম্ভব, যা থেকে যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে।

খানসামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার জানান, চাষিদের বেগুন চাষে উদ্বুদ্ধ করা ও বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়ায় এ অঞ্চলের চাষিরা ব্যাপকভাবে বেগুন চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এ অঞ্চলের মাটি বেগুন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় চলতি মৌসুমে প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন, অধিকাংশ কৃষক বেগুন বিক্রি করে প্রাথমিকভাবে ভালো দাম পেলেও, বর্তমানে বাজারে বেগুনের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তারপরও চাষিরা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। এই বছর খরার মাত্রা কম থাকায় বেগুনের পাশাপাশি অন্যান্য সবজি জাতীয় ফসলেরও ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত বেগুন শুধু জেলার চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহনে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলায়ও পাইকারি দরে পাঠানো হচ্ছে। কৃষি বিভাগ কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার ও মান সবসময় পর্যবেক্ষণ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।