মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃষি কেবল একটি পেশা বা খাদ্য উৎপাদনের পদ্ধতি নয়; কৃষিকে ঘিরেই মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে, গ্রাম ও নগরের জন্ম হয়েছে, খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, শ্রমের বিভাজন হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সভ্যতার নানা প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয়েছে। মানুষ যখন শিকার ও সংগ্রহের অনিশ্চিত জীবন থেকে মাটি চাষ করে খাদ্য উৎপাদনের পথে এগিয়ে গেল, তখন থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কও নতুন এক মাত্রা পেল। সেই অর্থে কৃষির ইতিহাস আসলে মানুষের সভ্য হয়ে ওঠার ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, নীলনদের উপত্যকা, সিন্ধু সভ্যতা কিংবা চীনের প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজ—প্রতিটি সভ্যতার বিকাশের পেছনে কৃষির একটি মৌলিক ভূমিকা ছিল। হাজার হাজার বছরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষ মাটি চিনেছে, বীজ নির্বাচন করেছে, সেচের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, ফসলের জাত উন্নত করেছে, পশুপালন শিখেছে এবং প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করেছে। কৃষির এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান হিসেবে সঞ্চারিত হয়েছে। আজকের আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান সেই দীর্ঘ মানবিক জ্ঞানযাত্রারই একটি উন্নততর পর্যায়।
আমার কাছে কৃষির সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য এখানেই। একটি বীজের মধ্যে আমরা শুধু একটি ভবিষ্যৎ গাছকে দেখি না; সেখানে একটি সম্ভাবনা দেখি। একটি উর্বর মাটির মধ্যে শুধু জমি দেখি না; দেখি খাদ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার ভিত্তি। একজন কৃষক যখন মাটির প্রকৃতি বুঝে ফসল নির্বাচন করেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন বিবেচনা করেন, বীজ সংরক্ষণ করেন কিংবা পানি ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা করেন, তখন তিনি আসলে বহু প্রজন্মের সঞ্চিত জ্ঞানকে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
কৃষি তাই আমার কাছে একই সঙ্গে বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার বিষয়। মৃত্তিকা বিজ্ঞান থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিসম্পদ থেকে মৎস্য, আবহাওয়া ও জলবায়ু থেকে জীবপ্রযুক্তি, সেচ থেকে কৃষিযন্ত্র, বীজ প্রযুক্তি থেকে ফসল-পরবর্তী সংরক্ষণ—কৃষির পরিসর আজ এতটাই বিস্তৃত যে একে শুধু ‘চাষাবাদ’ বলে দেখলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। আধুনিক কৃষি এখন তথ্য, প্রযুক্তি, গবেষণা, ব্যবস্থাপনা, বাজার ও উদ্যোক্তা-চিন্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মাটি, পানি, নদী, বৃষ্টি, ঋতুচক্র ও মানুষের জীবন—সবকিছুর সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের কৃষি জলবায়ু পরিবর্তন, জমির পরিবর্তিত ব্যবহার, পানি ও মাটির ওপর চাপ, উৎপাদন ব্যয়, বাজারব্যবস্থা এবং খাদ্যনিরাপত্তার মতো নানা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। কৃষি গুরুকুলের বিভিন্ন শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি করতে গিয়ে মাটি, বীজ, ফসল, পশুপালন, খামার ব্যবস্থাপনা, কৃষি-প্রযুক্তি এবং জলবায়ুর মতো বিষয়গুলোর পারস্পরিক সম্পর্কটি আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ হয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কৃষিবিজ্ঞানের কোনো বিশেষজ্ঞ নই, কৃষিবিদও নই। কৃষকের মাঠে দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতাও আমার নেই। তবে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার একজন অনুরাগী হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয় অনুভব করেছি—আমাদের দেশে কৃষির বাস্তব জ্ঞান এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে আরও শক্তিশালী সেতুবন্ধন প্রয়োজন। আমাদের কৃষক, কৃষি-শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে প্রতিভা ও সম্ভাবনার কোনো অভাব নেই; প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সঠিক তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করার।
এই উপলব্ধি থেকেই ‘কৃষি গুরুকুল’-এর যাত্রা।
আমি চাই, কৃষি গুরুকুল শুধু কৃষির কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে না থেকে কৃষিকে বোঝার একটি উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠুক। এখানে একজন শিক্ষার্থী যেমন কৃষির মৌলিক তত্ত্ব জানতে পারবে, তেমনি একজন কৃষকও প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক তথ্য খুঁজে পাবেন। মৃত্তিকার গুণাগুণ থেকে বীজের নির্বাচন, ফসল উৎপাদন থেকে রোগ ও বালাই ব্যবস্থাপনা, পশুপালন থেকে মৎস্যচাষ, কৃষিযন্ত্র থেকে ফসল-পরবর্তী প্রযুক্তি—কৃষির বিভিন্ন শাখার জ্ঞানকে সহজ ভাষায়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাসহ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। কৃষি গুরুকুলে ইতোমধ্যে কৃষিশিক্ষার বিভিন্ন স্তর, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি পাঠক্রম, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, বীজ ও বীজ প্রযুক্তি, কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশসহ নানা বিষয়ে শিক্ষামূলক কনটেন্টের একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে উঠেছে।
আমি বিশ্বাস করি, কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি উৎপাদনে নয়; আরও জ্ঞানভিত্তিক, টেকসই ও দক্ষ কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে। আমাদের এমন কৃষি দরকার, যেখানে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা হবে, পানির অপচয় কমবে, জীববৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে এবং কৃষকের শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পথও তৈরি হবে। একটি বীজ থেকে একটি ফসল এবং একটি ফসল থেকে একটি খাদ্যব্যবস্থা—এই পুরো ধারাটিকে বুঝতে না পারলে কৃষির ভবিষ্যৎকে আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে পারব না।
এর সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনাও আমি দেখি। কৃষিকে আমরা দীর্ঘদিন অনেক সময় শুধু গ্রামীণ জীবিকা হিসেবে দেখেছি। অথচ আধুনিক কৃষি একটি বিশাল জ্ঞান ও কর্মক্ষেত্র—এগ্রিটেক, কৃষিযন্ত্র, বীজ ও বায়োটেকনোলজি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি-উদ্যোক্তা, কৃষি-পরামর্শ, ডেটা ও প্রযুক্তি—অসংখ্য নতুন ক্ষেত্র এখানে তৈরি হচ্ছে। আমাদের তরুণরা যদি কৃষিকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চোখে দেখতে শেখে, তবে কৃষি শুধু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রই নয়, নতুন উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনেরও একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের তরুণরা একদিন শুধু নিজেদের জমির জন্য নয়, বিশ্বের কৃষির সমস্যার সমাধান নিয়েও কাজ করবে। আমাদের কৃষিবিদ, কৃষি-প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, উদ্যোক্তা ও দক্ষ কৃষকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করবেন; বাংলাদেশের কৃষি-অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবন আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত হবে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে জলবায়ু সহনশীল কৃষি—বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশও তার জ্ঞান ও মানুষ দিয়ে অবদান রাখবে। এটি হয়তো আজ একটি স্বপ্ন; কিন্তু বড় পরিবর্তনের শুরু অনেক সময় এমন ছোট স্বপ্ন থেকেই হয়।
আমি জানি, রাতারাতি কৃষির মতো একটি বিশাল ও বহুমাত্রিক জ্ঞানক্ষেত্রকে বদলে দেওয়া কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। একটি কৃষি-শিক্ষা প্ল্যাটফর্মও একা কৃষির ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সঠিক জ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শেখার সুযোগ তৈরি করা—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
তবে এখানে আমার নিজের একটি সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করতে চাই। আমার আগ্রহ ও কাজের ক্ষেত্র অনেক বিচিত্রমুখী। একদিকে শিক্ষা ও প্রযুক্তি, অন্যদিকে সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা—বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার মন অনেক দিকে ছড়িয়ে থাকে। এটি আমার একটি দুর্বলতাও বটে। ফলে কৃষি গুরুকুলকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাজটি আমার একার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।
তাই বাংলাদেশের এবং বিশ্বের কৃষিবিদ, গবেষক, কৃষক, কৃষি-প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক, উদ্যোক্তা এবং কৃষির সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ মানুষদের প্রতি আমার আন্তরিক আহ্বান—আপনারা ‘কৃষি গুরুকুল’-এর সঙ্গে যুক্ত হোন। আপনারা আপনাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই উদ্যোগের সঙ্গে ভাগ করে নিন। কৃষি গুরুকুলকে শুধু আমার উদ্যোগ হিসেবে নয়, কৃষি জ্ঞানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার একটি যৌথ উদ্যোগ হিসেবে আপন করে নিন।
আমি হয়তো এই যাত্রার সূচনাটুকু করতে পেরেছি। কিন্তু এর প্রকৃত পথ তৈরি করবেন কৃষিবিদ, শিক্ষক, গবেষক, কৃষক, শিক্ষার্থী এবং আগামী দিনের তরুণেরা। তাঁদের সম্মিলিত জ্ঞান, শ্রম ও অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই কৃষি গুরুকুল একদিন আরও দূর এগিয়ে যাবে—এই আমার বিশ্বাস।
কৃষি শুধু আমাদের খাদ্য দেয় না; কৃষি আমাদের সভ্যতার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে, আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক শেখায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই কৃষিকে আরও জ্ঞানভিত্তিক, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও টেকসই করে তোলার সামান্য প্রয়াস হিসেবেই ‘কৃষি গুরুকুল’-এর এই যাত্রা।
— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা
কৃষি গুরুকুল
